Breaking News

জীবিকার তাগিদে ভাঙছে পরিবার || RIGHTBD


ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার আচারগাঁওয়ে আজিজুল ইসলাম ও সুফিয়া বেগম দম্পতির বাস। তাদের বড় ছেলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্মী। সস্ত্রীক থাকেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। ব্যাংককর্মী দ্বিতীয় পুত্র থাকেন ময়মনসিংহ জেলা শহরে। তৃতীয় পুত্র থাকেন কর্মক্ষেত্র কক্সবাজারে। এই দম্পতির কনিষ্ঠ পুত্র রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তিন পুত্র-কন্যা নিয়ে থাকেন শ্বশুরবাড়িতে। সাত ছেলে-মেয়ে ও ১০ নাতি-নাতনি নিয়ে ১৯ সদস্যের পরিবারের মাত্র দুজন থাকেন আচারগাঁও গ্রামে। সরকারের হিসাবে আজিজুলের পরিবার এখন দুই সদস্যের ছোট পরিবার।
আজিজুল দম্পতির মতো বড় আকারের যৌথ পরিবারগুলো দ্রুত ভাঙছে। গড়ে উঠছে দুই থেকে চার সদস্যের ছোট পরিবার। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপেও বিষয়টি উঠে এসেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত জরিপের প্রাথমিক ফলাফলে জানানো হয়েছে, ২০১৬ সালে প্রতিটি খানায় সদস্যের সংখ্যা ৪ দশমিক ০৬ জনে নেমে এসেছে। ২০১০ সালে প্রতিটি খানায় মানুষের সংখ্যা ছিল ৪ দশমিক ৫০ জন করে। পাঁচ বছরে খানাপ্রতি সদস্যের সংখ্যা কমেছে দশমিক ৪৪।
অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, অর্থনীতির চালচিত্র বদলে যাওয়ার কারণে পরিবারের বন্ধন শিথিল হয়ে আসছে। বর্তমান বাজারে একজনের আয়ে সংসার চালানো অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই কাজ করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় বৃদ্ধ বাবা-মা বা শ্বশুর-শাশুড়ি অনেক পরিবারেই বোঝা হিসবে গণ্য হচ্ছেন। ফলে ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের ছেড়ে বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর শেষ ঠিকানা হচ্ছে গ্রামের বাড়ি।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনে জানা যায়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৯০ লাখ। ওই সময় দেশে পরিবারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯০ লাখ। এ হিসাবে প্রতি পরিবারে সদস্য ছিল ৮ জনের বেশি। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৩ লাখে উন্নীত হয়েছে। এ সময়ে পরিবারের সংখ্যাও ছাড়িয়েছে ৪ কোটি। ফলে প্রতিটি পরিবারে মানুষের সংখ্যা নেমে এসেছে আগের অর্ধেকে। পরিবারের আকার কমে আসায় বৃদ্ধ ও বয়স্করা বেকায়দায় রয়েছেন বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানীরা।
এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন নিজেরা করি’র প্রধান নির্বাহী খুশী কবির বাংলাদেশের খবরকে বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধীরগতির কারণে পরিবারে সদস্য সংখ্যা কমে এলে দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। তবে বর্তমানে যৌথ পরিবারে ভাঙনের কারণে ছোট পরিবার গড়ে উঠছে। এসব পরিবারে বয়স্ক বাবা-মা অনেক সময় বোঝা হিসেবে গণ্য করে থাকে সন্তানরা। তবে আশার কথা, বাবা-মায়ের ভরণ-পোষণে সরকার ইতোমধ্যেই আইন করেছে। তিনি আরো বলেন, আইনি বাধ্যবাধকতায় প্রবীণ সমাজের কল্যাণ নিশ্চিত করা কঠিন। বয়স্ক মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পল্লী এলাকায় এখনো খানাপ্রতি সদস্যের সংখ্যা শহর অঞ্চলের চাইতে তুলনামূলক বেশি। শহরে বর্তমানে প্রতিটি খানায় সদস্যের সংখ্যা ৩ দশমিক ৯৩ জন। আর পল্লী এলাকায় প্রতিটি খানায় থাকছেন গড়ে ৪ দশমিক ১১ জন করে। এ হিসাবে পল্লী অঞ্চলে পারিবারিক বন্ধন এখনো তুলনামূলক বেশি অটুট রয়েছে বলে মনে করছেন পরিসংখ্যান ব্যুরোর কর্মকর্তারা।
২০০০ সালের পর থেকেই খানাপ্রতি সদস্যের সংখ্যা কমে আসছে বলে বিবিএস সূত্র জানিয়েছে। সংস্থাটির নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০০ সালে প্রতি পরিবারে সদস্য সংখ্যা ছিল গড়ে ৫ দশমিক ১৮ জন। ২০০৫ সালে সংখ্যাটি নেমে আসে ৪ দশমিক ৮৪ জনে। ২০১০ সালে পরিবারপ্রতি মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় সাড়ে ৪ জনে। আর সর্বশেষ জরিপে প্রতি পরিবারে সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে গড়ে ৪ দশমিক ০৬ জনে। এ হিসাবে ১৬ বছরে প্রতিটি পরিবারের সদস্য সংখ্যা কমেছে গড়ে ১ দশমিক ১২ জন।
সরকারি হিসাবে দেশে বর্তমানে জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৩ লাখ। এর মধ্যে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ রয়েছেন ৭৯ লাখ। এ হিসাবে দেশের মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৯ জন প্রবীণ। দেশে পুরুষ ও নারীর সংখ্যা যথাক্রমে ৪৬ লাখ ও ৩৩ লাখ। শহর এলাকায় ১৭ লাখ প্রবীণ বাস করেন। আর পল্লী এলাকায় থাকছেন ৬২ লাখ প্রবীণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের অধ্যাপক এএসএম আতীকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের শিশুরা তাদের সব আবদার তুলে ধরে দাদা-দাদি আর নানা-নানির কাছে। দাদা-দাদি, নানা-নানি তাদের নাতি-নাতনিদের সামাজিক মূল্যবোধগুলো শিখিয়ে দেন। একটা সময় বৃদ্ধদের বলা হতো ক্ষয়ে যাওয়া মানবাংশ। আগামী প্রজন্মের বিকাশ নিশ্চিত করতে এমন মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, বাবা-মায়ের ব্যস্ততার কারণে সন্তানেরা অনেক সময় যথেষ্ট মনোযোগ পায় না। এতে পারিবারিক বন্ধন আলগা হয়ে যায়। যেসব পরিবারে দাদা-দাদি, নানা-নানি থাকেন, সেসব পরিবারে বন্ধনটা থাকে। শিশুদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের সমস্যা থাকে না। শিশুরা মানবিকতার চর্চা শেখে। শিশুটি যখন বড় হয়ে পরিবার গঠন করে, সেও একটি ভালো পরিবার গড়ে। আবেগ-অনুভূতিকে সম্মান দিতে শেখে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৭৫০ থেকে ১৮৫০ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ড এবং আমেরিকায় শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা দেশগুলোর যুবসমাজ অর্থ উপার্জনে ঝুঁকে পড়েন। এতে পরিবারের প্রতি তাদের আগ্রহ কমে আসে। অনেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় পরিবার থেকে। কাজ ও অর্থের প্রয়োজনে অনেকেই ছোট পরিবার গড়ে তুলেছে। এভাবেই ভেঙে গেছে অনেক যৌথ পরিবার।
এরই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৮৪ সালে পারিবারিক সঙ্কটগুলো নিরসনের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি পাঁচসালা পরিকল্পনা নিতে সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানায়। ১৯৮৯ সালে এক প্রস্তাবে সাধারণ পরিষদ ১৯৯৩ সালকে বিশ্ব পরিবার বর্ষ হিসেবে অনুমোদন করে। একই সময়ে ১৫ মে’কে বিশ্ব পরিবার দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বিশ্বব্যাপী মূল্যবোধের দিকে ফিরে যাওয়ার সংস্কৃতি জোরদার করা এবং পরিবারগুলোর ভিত্তিকে শক্তিশালী করতেই দিবসটির সূচনা করা হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের পারিবারিক কাঠামো মজবুত করতেও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে পালন করা হচ্ছে।

No comments

'; (function() { var dsq = document.createElement('script'); dsq.type = 'text/javascript'; dsq.async = true; dsq.src = '//' + disqus_shortname + '.disqus.com/embed.js'; (document.getElementsByTagName('head')[0] || document.getElementsByTagName('body')[0]).appendChild(dsq); })();