Breaking News

গুজবকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে সরকার || RIGHTBD




গুজবকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে সরকার।মঙ্গলবার পর্যন্ত গুজব রটানো শতাধিক ব্যক্তি ও ফেসবুক পেজকে শনাক্ত করেছে বিভিন্ন সংস্থা। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মামলা হয়েছে। বাকিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে শিগগিরই।

এ বিষয় নিয়ে সরকারের বেশ কয়েকটি সংস্থা কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পিলখানা, হেফাজত আন্দোলন, কোটা আন্দোলনের পর এবার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের গুজব সরকারকে বেশ ভুগিয়েছে। এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এসব তালিকায় আছেন অনেক সেলিব্রিটিও। 

সূত্র জানায়, শিক্ষার্থীদের অহিংস আন্দোলনে গুজব ছড়িয়ে যারা পরিস্থিতিকে ভয়ঙ্কর করে তুলেছিল তাদের ৭০ ভাগই দেশের বাইরে। আর দেশ থেকে যে ৩০ ভাগ গুজব ছড়ানো হয়েছে তাদের কিছু আইডি ভুয়া। তারপরও অনেককে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।



সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গুজব ছড়ানোর বড় জায়গা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। এবার টুইটারেও অনেকে গুজব ছড়িয়েছে। বাংলাদেশে ফেসবুকের কোনো অফিস না থাকায় এসব ফেসবুক অ্যাকাউন্টের বিষয়ে তথ্য জোগাড় করতে সমস্যায় পড়তে হয় বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। ফেসবুক কর্তৃপক্ষের দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয় সিঙ্গাপুরে। শিগগিরই ফেসবুককে বাংলাদেশে অফিস খোলার প্রস্তাব দেওয়া হবে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে অফিস না খুললে, ভবিষ্যতে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সরকার ফেসবুকের বিষয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ফেসবুকের ‘সমস্যা’র কথা গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে,  এবারের শিক্ষার্থী আন্দোলনে শনি ও রবিবার থেকে বিভিন্ন গুজবের লিংক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা, প্রভাবশালী দেশসমূহের দফতরে পাঠানো হয়। বিভিন্ন দেশের সরকারি দফতরে একটি আইডি থেকেই এসব লিংক মেইল করা হয়েছে। তার সন্ধানও পেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনস্থ একটি সংস্থা। 

এর পাশাপাশি অনলাইন থেকে বা বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের ই-মেইল ঠিকানা সংগ্রহ করে বাংলাদেশ থেকে এ ধরনের বার্তা পাঠানো হয়েছে। ই-মেইল পাঠানো ব্যক্তিদের অনেকে নিজেদের আক্রান্ত হিসেবে দাবি করে এমন কিছু ভুয়া ভিডিও ও ছবি পাঠিয়েছে।


শুধু বিদেশি সাংবাদিকই নন, বিভিন্ন দেশের সংবাদ মাধ্যম, জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দফতর, পররাষ্ট্র দফতরসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্যাগ করে আন্দোলন, হামলার খবর দেওয়ার পাশাপাশি সহযোগিতা চেয়েছে অনেকে। বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলন, হামলা ও সংঘাতের খবর দেওয়ার সময় অনেকেই ‘জেনোসাইড’ (গণহত্যা) লিখে বিদেশিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কেউ কেউ আবার বাংলাদেশে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী চেয়েছে।

প্রকৃত নাম ও ছদ্ম নামে এসব টুইট বার্তা দেওয়া ব্যক্তিরা আন্দোলনকারী বা আন্দোলনের প্রতি সমর্থক অনলাইনকর্মী বলে জানা গেছে। তবে রাজনৈতিক পরিচয় আছে, এমন অনেক ব্যক্তির টুইট বার্তায়ও বিদেশি সংবাদ মাধ্যম ও সরকারগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দলের উপদেষ্টা কয়েকটি টুইট বার্তায় ছাত্র আন্দোলনে নৃশংসতা, ধর্ষণ হয়েছে বলে দাবি করে সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস, পররাষ্ট্র দফতর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপদেষ্টা লিসা কার্টিসকে ট্যাগ করেছেন।

বাংলাদেশে বিদেশি দূতাবাসগুলোর ফেসবুক ও টুইটার পেজেও অনেকে হস্তক্ষেপ ও সহযোগিতা চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ফেসবুক পেজের মন্তব্য অংশে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এ ধরনের কয়েকটি বার্তা দেখা গেছে। অনেকে আবার বিদেশি দূতাবাসের ফেসবুক পেজে এ দেশের সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছে। অনেকে তাদের বার্তায় বীভৎস ছবি প্রকাশ করে সিরিয়া পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেছে।


কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, অতীতের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির মতো এবারের ছাত্র আন্দোলনের সময় তারা পরিচিত ও অজ্ঞাত পরিচয় বিভিন্ন মাধ্যম থেকে নানা বার্তা পাচ্ছে। তবে যাচাই-বাছাই করেই তারা সেগুলো আমলে নেন।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, গত কয়েক দিনে সারা বাংলাদেশ একটা গুজবের কারখানায় পরিণত হয়েছে। আর এই কারখানার রসদ জুগিয়েছে একটি কুচক্রী মহল। সর্বশেষ নিরাপদ সড়ক দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ‘চারজনকে মেরে ফেলা হয়েছে’, ‘শিক্ষার্থীদের ধর্ষণ করা হয়েছে’Ñ কুচক্রি মহল থেকে এমন নানা গুজব ছড়ানো হয়েছে। আর এই উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষার্থীরা ছুটে এসে গত শনিবার ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে পাথর, ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে হামলা চালায়। হামলাকারীদের কয়েক জনের হাতে লাঠি ও আগ্নেয়াস্ত্রও ছিল। 



শুধু তা-ই নয় ‘চারজন ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হচ্ছে’ বলেও জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভিডিও লাইভের মাধ্যমে বলা হলো। ফেসবুকে বিভিন্ন পেইজ থেকে এই গুজবের সমর্থনে কোনো সূত্র ছাড়াই তথ্য প্রচার করা হচ্ছিল। এরপরে গুজবকে সত্যি করতে জনপ্রিয় অভিনেত্রী কাজী নওশাবা ফেসবুকে লাইভে তরুণদের উসকে দিয়েছেন। 

এর আগে কোটা সংস্কার আন্দোলনের তুঙ্গেও এক মধ্যরাতে অনেক গুজব ছড়িয়ে পড়ে। গুজবের কারণে চট্টগ্রামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে ভয়াবহ হামলা হয়েছে। হেফাজত আন্দোলনের সময়েও অনেক গুজব ছড়িয়েছিল।

সাম্প্রতিক গুজবে আক্রান্ত হয়ে সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেশের জনগণকে ক্ষুদে বার্তা পাঠাতে হয়। এতে বলা হয়, ‘রাজধানীর ঝিগাতলায় ছাত্রহত্যা ও ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনার কোনো সত্যতা নেই। বিষয়টি পুরোপুরি গুজব। এতে কেউ বিভ্রান্ত হবেন না। পুলিশকে গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন।’ 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলধারার গণমাধ্যমে সমস্যা দেখা দিলে বিকল্প মাধ্যমে মানুষ গুজব ছড়ানোর সুযোগ পায়। গুজবকারীরা সুযোগ পেলে মেইনস্ট্রিম ও সোশ্যাল মিডিয়া সব ক্ষেত্রেই এটা করবে। এগুলো তাদের রুচির বহিঃপ্রকাশ। তবে গুজবের কার্যকারিতা বা প্রভাব বেশিক্ষণ থাকে না। এটা তৎক্ষণিকভাবে একটি প্রভাব সৃষ্টি করে।



ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও গণযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, গুজব সব সময়ই একটি সমস্যা। যেটা সোশ্যাল মিডিয়াতে বেশি হয়। এক্ষেত্রে যারা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে তাদের অনেক বেশি দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে হবে। এখানে নানা রকম মতামত আসবে। সব মতামতকে আমরা গ্রহণ করব না। কোনো একটা তথ্য পাওয়ার পর সেটাকে যাচাই বাছাই না করে বিশ্বাস করা যাবে না। এক্ষেত্রে মূলধারার গণমাধ্যমে যখন কোনো সমস্যা হবে তখনই মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্য নিয়ে গুজব ছড়াবে এবং যারা এই গুজব ছড়াচ্ছে তারা এটা নিজেদের স্বার্থেই করবে জনস্বার্থে নয়। এছাড়া গুজবকারীরা সুযোগ পেলে মেইনস্ট্রিম ও সোশ্যাল মিডিয়া সব ক্ষেত্রেই এটা করবে। এগুলো তাদের রুচির বহিঃপ্রকাশ। তবে গুজবের কার্যকারিতা বা প্রভাব বেশিক্ষণ থাকে না। এটা তৎক্ষণিকভাবে একটি প্রভাব সৃষ্টি করে।

গোয়েন্দাদের নজরদারিতে শতাধিক ফেসবুক টুইটার আইডি
নিরাপদ সড়কসহ বিভিন্ন দাবিতে এক সপ্তাহ ধরে রাজপথ দখল করে থাকা শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরে গেছে। পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট সদস্যরা এখন ব্যস্ত অভিনয় শিল্পীদের নিয়ে। সাইবার ক্রাইম ইউনিটের পাশপপাশি সিআইডি ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা আরও শতাধিক ফেসবুক টুইটার আইডির মালিক এডমিনদের চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে কয়েকজন অভিনয় শিল্পীও আছেন। এদের গতিবিধির ওপর কড়া নজরদারি রয়েছে। যেকোনো সময় এদের গ্রেফতার করা হতে পারে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। 




পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, মৃত্যু, চোখ উৎপাটন ও ধর্ষণের মতো মিথ্যা তথ্য প্রচার করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে যারা সহিংস করে তুলেছে তাদের খুঁজে বের করার কাজ চলছে। পুলিশ বলছে, এ জন্য তারা প্রাথমিকভাবে ফেসবুকের ২০০ মতো অ্যাকাউন্টকে সন্দেহ করেছিলেন। কিন্তু গত দুদিনের তদন্তের পর এখন এই সংখ্যা কমে এসেছে। তাদের মতে, এই অ্যাকাউন্টগুলো পর্যালোচনা করে তারা এখন উসকানিমূলক তথ্য প্রচারকারী ও গুজব রটনাকারীদের খুঁজে বের করবেন। এসবের মধ্যে রয়েছে ফেসবুক পেইজ, ফেসবুকে ও টুইটারে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট এবং কিছু অনলাইন পোর্টাল। এদের অপরাধের ধরন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সাইবার ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেন, সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে আন্দোলনের ডাক দেওয়া একটি গণতান্ত্রিক বিষয়। কিন্তু কিছু লোক যখন মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে ফেসবুকের অপব্যবহার করে সহিংসতায় প্ররোচনা দেয়। তখন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াটা জরুরি হয়ে পড়ে।  

ইতোমধ্যে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে অভিনেত্রী নওশাবাসহ পাঁচ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গোয়েন্দা পুলিশ ও পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সদস্যরা এর নেপথ্যে আরও কেউ জড়িত আছে কি না সেটা বের করার চেষ্টা করছেন। 

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে ২৮ আইডির বিরুদ্ধে গত ২ আগস্ট রাজধানীর রমনা থানায় ওই মামলা করা হয়। ওই আইডিগুলো থেকে মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রকাশ করে  কোমলতি শিশুদের মনকে নষ্ট করে তাদের খারাপ কাজের জন্য উৎসাহিত করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা আইডিগুলোর মধ্যে রয়েছে, জুম বাংলা নিউজ পোর্টাল, বিএনপি সমর্থক গোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদ, অ্যাক্সিডেন্ট নিউজ, বাংলামেইল ৭১, বাঁশেরকেল্লা, ফাইট ফর সারভাইভার্স রাইট, ফাঁকিবাজ লিংক, আন্দোলন নিউজ। এছাড়া ট্ইুটার আইডিগুলো হচ্ছে- রানা মাসুম-১, নওরিন-০৭, দিপু খান বিএনপি, ইদ্রিস হোসেইন, এম আল আমিন-৯৯, বিপ্লবী কাজী, নাসিফ ওয়াহিদ ফায়জাল।



উসকানির ও গুজব ছড়ানোর বিষয়ে গত শনিবার সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, গোয়েন্দা ও সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্যে জানা গেছে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে পলিটিসাইজ করার চেষ্টা চলছে। ছাত্রদের স্কুল ড্রেসের বিক্রি ও বানানোর হিড়িক লেগেছে। আমরা ছাত্রদের নিরাপত্তার জন্য শঙ্কিত। যারা এসব কাজ করছে তাদের আমরা চিহ্নিত করেছি। এদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের ব্যাপার। 

No comments