Breaking News

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার রায় ১০ অক্টোবর || RIGHTBD

ইতিহাসের বর্বরোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও হত্যা মামলার নিম্ন আদালতের বিচারকাজ শেষ হয়েছে। আগামী ১০ অক্টোবর এই আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। ১৪ বছর বিচারিক কার্যক্রম শেষে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নুর উদ্দীন এই রায়ের দিন ধার্য করেন। একই সঙ্গে এই মামলায় জামিনে থাকা সাবেক ৩ আইজিপিসহ ৮ আসামির জামিন বাতিল করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। সব আসামির অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হওয়ায় তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। অপরদিকে আসামিদের জন্য আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেছেন আসামি পক্ষের আইনজীবীরা।
গতকাল বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে আদালতের কার্যক্রম শুরুর পর আসামিপক্ষে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান আদালতে যুক্তিতর্ক তুলে ধরেন। দুপুর দেড়টার দিকে যুক্তিতর্কের শুনানি শেষ হয়। এর পরে বিচারক রায়ের দিন ঠিক করে দেন। এর আগে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।
অন্যান্য দিনের মতো কারাগারে থাকা সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ২৩ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। হাজির হন খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা, শহিদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরীসহ জামিনে থাকা ৮ আসামিও। এই ৮ আসামির জামিন বাতিল করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন গতকাল আদালত।
আদালতে শুরুতেই রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান জানান, এই মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য আসামিপক্ষ ৯০ দিন ও রাষ্ট্রপক্ষ ৩০ দিন সময় নিয়েছে। মোট ১২০ দিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়েছে এই মামলায়।
আসামি পক্ষে গতকাল যুক্তি উপস্থাপন করে এস এম শাহজাহান বলেন, এই মামলার কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই। এ মামলা ভিত্তিহীনভাবে সাজানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ মামলায় কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আসামিদের জন্য আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন তিনি। পরে সিনিয়র আইনজীবী আব্দুর রেজাক খান ও খন্দকার মাহবুব হোসেন সব আসামির পক্ষে সংক্ষিপ্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।
যুক্তি উপস্থাপন শেষে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, গ্রেনেড হামলার মূল উদ্দেশ ছিল প্রধানমন্ত্রী (ওই সময় বিরোধী দলীয় নেতা) শেখ হাসিনাকে হত্যা করা। তাকে হত্যা করা সম্ভব না হলেও আইভি রহমানসহ ২২ জনকে হত্যা করা হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে ২৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই মামলায় কাউকে রাজনৈতিকভাবে জড়ানো হয়নি বা আটক করা হয়নি। রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এই মামলার রায় দেয়া হবে না বলেও জানান তিনি। পরে এই মামলায় আট জন আসামির জামিনে থাকা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, আসামিরা জামিনে থাকলে ফের নাশকতা করতে পারে কিংবা তারা পালিয়ে যেতে পারে। সে জন্য আমরা আসামিদের জামিন বাতিলের আবেদন জানাই।
আসামিদের জামিন বাতিলের আবেদনের বিপক্ষে শুনানি করেন কয়েক আইনজীবী। তারা বলেন, জামিনে থাকা আসামিরা নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিয়েছেন। তাদের জামিন রায় পর্যন্ত বহাল রাখা হলেও তারা পালিয়ে যাবেন না। তাছাড়া তাদের অনেকের পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র আদালতে জমা দেয়া আছে। তাই আদালতের কাছে রায় ও আদেশ পর্যন্ত তাদের জামিন বহালের আবেদন জানাই।
যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন বলেন, দীর্ঘ শুনানির পর আমরা এই মামলার শেষ পর্যায়ে এসেছি। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের ধন্যবাদ জানাই। এসময় তিনি আইনের ব্যাখ্যা সঠিকভাবে তুলে ধরার জন্য গণমাধ্যমকর্মীদেরও ধন্যবাদ জানান। বিচারক আরো বলেন, আদালত প্রাঙ্গণের প্রতিটি ফ্যান-লাইটের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ চেনাজানা তৈরি হয়েছে। আসামিদের সঙ্গেও তাদের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তারপরও মামলাটি শেষ পর্যায়ে এসেছে। এবার রায়ের দিন ঠিক করতে হবে। এরপর বিচারক আগামী ১০ অক্টোবর এই মামলার রায়ের দিন ঠিক করে দেন। একইসঙ্গে এই মামলার আট আসামির জামিন বাতিল করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন তিনি।
এর আগে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী (পিপি) সৈয়দ রেজাউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, সব আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ সব আসামির অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হওয়ায় তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান তিনি।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের জনসভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। হামলায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নির্মমভাবে নিহত হন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। আহত হন শতাধিক নেতাকর্মী। তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ইন্ধনে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশসহ (হুজি) তিনটি জঙ্গি সংগঠন হামলা চালায় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় ২০০৪ সালের ২২ আগস্ট মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফারুক হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল ও সাবের হোসেন চৌধুরী বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় পৃথক তিনটি মামলা করেন। মতিঝিল থানার এসআই শরীফ ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে একটি মামলা (নং-৯৭) দায়ের করেন। ২০০৮ সালের ৯ জুন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে সিএমএম আদালতে দুটি অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন সিআইডির সিনিয়র এএসপি ফজলুল কবির। ওই বছরই মামলা দুটির কার্যক্রম দ্রুত বিচার আদালত-১-এ স্থানান্তর করা হয়। এ আদালতে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের ২৯/১১ (হত্যা),ও ৩০/১১ (বিস্ফোরক) মামলা দুটির বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।
৬১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের পর ২০০৯ সালের ২৫ জুন এ মামলার অধিকতর তদন্তের আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। ওই বছরের ৩ আগস্ট আদালত অধিকতর তদন্তের আবেদন মঞ্জুর করেন। পরে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ও আবদুস সালাম পিন্টুসহ ৩০ জনকে অভিযুক্ত করে ২০১১ সালের ২ জুলাই আদালতে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা আবদুল কাহার আকন্দ। অধিকতর তদন্তে গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) পাশাপাশি হাওয়া ভবনের সংশ্লিষ্টতাও খুঁজে পান তিনি।
মামলার অভিযোগ প্রমাণে চার্জশিটের ৫১১ সাক্ষীর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২২৫ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। গত বছরের ৩০ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দের জেরা শেষের মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। এ মামলায় মোট আসামি ছিলেন ৫২ জন। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মামলার অন্যতম আসামি সাবেক মন্ত্রী ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি ২০১৫ সালের ২১ নভেম্বর রাতে কার্যকর হয়। এ ছাড়া ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল রাতে মুফতি হান্নান ও তার সহযোগী শরীফ শাহেদুল ওরফে বিপুলের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ফলে বর্তমানে মামলার আসামির সংখ্যা ৪৯ জন।
৪৯ আসামির মধ্যে ৮ জন জামিনে, ১৮ জন পলাতক ও ২৩ জন কারাগারে রয়েছেন। জামিনে থাকা মামলার আসামিরা হলেন- খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা, শহিদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরী এবং মামলাটির তিন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান, এএসপি আব্দুর রশীদ ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম।
অন্যদিকে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ২৩ জন কারাগারে বন্দি আছেন। আর পলাতক রয়েছেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিএনপির সাবেক এমপি কাজী শাহ মোফাজ্জেল হোসেন কায়কোবাদসহ ১৮ আসামি। তাদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে।
পলাতক আসামিদের অবস্থান: বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান বর্তমানে লন্ডনে রয়েছেন। এই দলের নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন কায়কোবাদ ব্যাংককে, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক হানিফ কলকাতায়, মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন আমেরিকায়, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার কানাডায়, বাবু ওরফে রাতুল বাবু ভারতে, আনিসুল মোরসালীন এবং তার ভাই মুহিবুল মুক্তাকীন ভারতের কারাগারে এবং মাওলানা তাজুল ইসলাম দক্ষিণ আফ্রিকায় রয়েছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া জঙ্গি নেতা শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা আবু বকর, ইকবাল, খলিলুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে বদর, মাওলানা লিটন ওরফে জোবায়ের ওরফে দেলোয়ার, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন উপকমিশনার (পূর্ব) এবং উপকমিশনার (দক্ষিণ) ওবায়দুর রহমান ও খান সাঈদ হাসান পাকিস্তানে রয়েছেন।

No comments